শহর পুলিশ ফাঁড়ির দক্ষিণ পাশে, স্টেডিয়াম রোড, লক্ষ্মীপুর, বাংলাদেশ
রিপোর্ট ডাউনলোড English Bangla
blog Photo
  • প্রকাশিত: Oct 15, 2026

নবজাতকের যত্নে করণীয় ও যেসব বিষয়ে সতর্ক থাকবেন

একটি নবজাতক শিশুর জন্ম একটি পরিবারের জন্য আনন্দের মুহূর্ত। তবে জন্মের পর প্রথম ২৮ দিন শিশুর জীবনের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সময়। এ সময় শিশুর শরীর বাইরের পরিবেশের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেয় এবং সংক্রমণসহ বিভিন্ন স্বাস্থ্যঝুঁকির আশঙ্কা থাকে। তাই নবজাতকের সঠিক যত্ন, পুষ্টি, পরিচ্ছন্নতা ও নিয়মিত স্বাস্থ্য পর্যবেক্ষণ অত্যন্ত জরুরি।

সেইফ হাসপাতালের পক্ষ থেকে নতুন বাবা-মা ও পরিবারের সদস্যদের জন্য নবজাতকের যত্নে করণীয় এবং যেসব বিষয়ে সতর্ক থাকা প্রয়োজন, তা তুলে ধরা হলো।

১. জন্মের পরপরই শিশুকে উষ্ণ রাখুন

জন্মের পর নবজাতকের শরীর দ্রুত ঠান্ডা হয়ে যেতে পারে। তাই শিশুকে পরিষ্কার ও শুকনো কাপড় দিয়ে মুছে মায়ের বুকের সঙ্গে ত্বক-থেকে-ত্বক সংস্পর্শে রাখুন। শিশুর মাথায় নরম টুপি এবং প্রয়োজন অনুযায়ী পরিষ্কার কাপড় ব্যবহার করুন। ঘরের পরিবেশ আরামদায়ক রাখুন এবং শিশুকে ঠান্ডা বাতাস থেকে রক্ষা করুন।

সতর্কতা: শিশুকে অতিরিক্ত কাপড়ে মুড়িয়ে গরম করে ফেলবেন না। হিটার, আগুন বা গরম পানির ব্যাগ সরাসরি শিশুর কাছে রাখবেন না।

২. জন্মের প্রথম ঘণ্টার মধ্যে বুকের দুধ খাওয়ান

জন্মের পর যত দ্রুত সম্ভব, আদর্শভাবে প্রথম এক ঘণ্টার মধ্যে শিশুকে মায়ের বুকের দুধ খাওয়ানো শুরু করুন। মায়ের প্রথম দুধ বা শালদুধে গুরুত্বপূর্ণ পুষ্টি ও রোগপ্রতিরোধী উপাদান থাকে, যা শিশুকে সংক্রমণ থেকে সুরক্ষা দিতে সাহায্য করে।

প্রথম ছয় মাস শিশুকে শুধু মায়ের বুকের দুধ খাওয়ানোর চেষ্টা করুন। চিকিৎসকের বিশেষ পরামর্শ ছাড়া পানি, মধু, চিনির পানি বা অন্য কোনো খাবার দেওয়ার প্রয়োজন নেই।

সতর্কতা: নবজাতককে মধু খাওয়াবেন না। এতে শিশুর বটুলিজম নামের গুরুতর অসুস্থতার ঝুঁকি থাকতে পারে।

৩. শিশুর নাভির যত্ন নিন

নবজাতকের নাভির গোড়া পরিষ্কার ও শুকনো রাখা জরুরি। নাভির অংশে ময়লা লাগলে পরিষ্কার পানি দিয়ে আলতোভাবে পরিষ্কার করে শুকিয়ে নিন। ডায়াপার এমনভাবে পরান, যেন তা নাভির গোড়া ঢেকে না রাখে।

সাধারণত নাভির অবশিষ্ট অংশ এক থেকে দুই সপ্তাহের মধ্যে নিজে থেকেই শুকিয়ে পড়ে যায়।

সতর্কতা: নাভিতে তেল, হলুদ, পাউডার, ছাই বা অন্য কোনো ঘরোয়া উপাদান লাগাবেন না। নাভির চারপাশ লাল হয়ে যাওয়া, পুঁজ বের হওয়া, দুর্গন্ধ বা রক্তপাত হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।

৪. শিশুকে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখুন

শিশুকে ধরার আগে সাবান দিয়ে হাত ধুয়ে নিন। শিশুর কাপড়, তোয়ালে ও বিছানা পরিষ্কার রাখুন। ডায়াপার ভিজে বা ময়লা হয়ে গেলে দ্রুত পরিবর্তন করুন এবং ত্বক আলতোভাবে পরিষ্কার করে শুকিয়ে নিন।

শিশুকে গোসল করানোর সময় পানি কুসুম গরম কি না, তা আগে পরীক্ষা করুন। জন্মের পর প্রথম গোসল অন্তত ২৪ ঘণ্টা পিছিয়ে দেওয়া ভালো; শিশুর শরীরের তাপমাত্রা স্থিতিশীল থাকা এবং প্রয়োজনীয় পরিচর্যার বিষয়টিও বিবেচনা করতে হবে।

সতর্কতা: শিশুকে কখনো একা গোসলের পানিতে বা উঁচু কোনো স্থানে রেখে যাবেন না। কটন বাড বা অন্য কোনো বস্তু শিশুর কানের ভেতরে প্রবেশ করাবেন না।

৫. নিরাপদ ঘুম নিশ্চিত করুন

নবজাতক দিনে অনেক সময় ঘুমায়। শিশুকে প্রতিবার ঘুমানোর সময় চিত করে শোয়ান। ঘুমানোর জন্য সমতল, শক্ত ও নিরাপদ বিছানা ব্যবহার করুন। শিশুর ঘুমের জায়গায় বালিশ, ভারী কম্বল, নরম খেলনা বা ঢিলেঢালা কাপড় রাখবেন না।

সম্ভব হলে শিশুর খাট বা আলাদা ঘুমানোর জায়গা বাবা-মায়ের বিছানার কাছাকাছি রাখুন।

সতর্কতা: শিশুকে উপুড় করে বা কাত করে ঘুম পাড়াবেন না। অতিরিক্ত নরম গদি ও ঢিলেঢালা বিছানাপত্র শ্বাসরোধের ঝুঁকি বাড়াতে পারে।

৬. শিশুর শরীরের তাপমাত্রা ও শ্বাস-প্রশ্বাস পর্যবেক্ষণ করুন

নবজাতকের স্বাভাবিক শারীরিক অবস্থা সম্পর্কে সচেতন থাকুন। শিশু স্বাভাবিকভাবে শ্বাস নিচ্ছে কি না, দুধ খাচ্ছে কি না, স্বাভাবিকভাবে নড়াচড়া করছে কি না এবং শরীরের রং স্বাভাবিক আছে কি না, তা খেয়াল করুন।

শিশুর শরীর অস্বাভাবিক গরম বা ঠান্ডা মনে হলে তাপমাত্রা মাপুন। নবজাতকের তাপমাত্রা ৩৮° সেলসিয়াস বা তার বেশি হলে দ্রুত চিকিৎসা নিন।

সতর্কতা: শিশুর শ্বাস নিতে কষ্ট হওয়া, বুক দেবে যাওয়া, ঠোঁট নীলচে হওয়া, অস্বাভাবিক নিস্তেজতা বা জাগাতে অসুবিধা হলে অবিলম্বে জরুরি বিভাগে যান।

৭. প্রস্রাব, পায়খানা ও জন্ডিসের লক্ষণ খেয়াল করুন

জন্মের পর শিশুর প্রস্রাব ও পায়খানার ধরন পর্যবেক্ষণ করুন। প্রথম কয়েক দিনে প্রস্রাবের সংখ্যা ধীরে ধীরে বাড়ে। শিশু পর্যাপ্ত দুধ পাচ্ছে কি না, তা বোঝার জন্য প্রস্রাব, পায়খানা, দুধ খাওয়ার ধরন এবং ওজন বৃদ্ধির দিকে নজর দিন।

নবজাতকের জন্ডিসে ত্বক ও চোখের সাদা অংশ হলুদ হয়ে যেতে পারে। এটি অনেক শিশুর ক্ষেত্রে দেখা গেলেও কখনো কখনো বিপজ্জনক মাত্রায় পৌঁছাতে পারে।

সতর্কতা: জন্মের প্রথম ২৪ ঘণ্টার মধ্যে জন্ডিস দেখা দিলে, হলুদভাব দ্রুত বাড়লে, শিশু দুধ খেতে না চাইলে বা অস্বাভাবিক নিস্তেজ হলে দ্রুত চিকিৎসা নিন। জন্ডিসের চিকিৎসা হিসেবে শিশুকে সরাসরি রোদে রাখার ওপর নির্ভর করবেন না।

৮. টিকা ও নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা নিশ্চিত করুন

জন্মের পর শিশুর প্রয়োজনীয় টিকা, নবজাতকের স্বাস্থ্য পরীক্ষা, ওজন পর্যবেক্ষণ এবং চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী অন্যান্য পরীক্ষা নিশ্চিত করুন। জন্মের পর প্রাথমিক স্বাস্থ্য পরীক্ষা সম্পন্ন করুন এবং হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র পাওয়ার পর নির্ধারিত সময়ে ফলোআপে যান।

শিশুর জন্মের ওজন, খাওয়ার ধরন, প্রস্রাব-পায়খানা এবং শারীরিক অবস্থার পরিবর্তন চিকিৎসককে জানান।

সতর্কতা: টিকার সময়সূচি নিয়ে সন্দেহ থাকলে নিকটস্থ টিকাদান কেন্দ্র বা চিকিৎসকের সঙ্গে যোগাযোগ করুন। নিজে থেকে কোনো টিকা বা ওষুধের সময়সূচি পরিবর্তন করবেন না।

৯. নবজাতককে সংক্রমণ থেকে রক্ষা করুন

নবজাতকের রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা এখনও পুরোপুরি বিকশিত হয় না। তাই শিশুকে ধরার আগে সবাইকে হাত পরিষ্কার করতে বলুন। অসুস্থ ব্যক্তি, সর্দি-কাশিতে আক্রান্ত ব্যক্তি এবং সংক্রমণের লক্ষণ রয়েছে এমন ব্যক্তিদের শিশুর কাছাকাছি আসা সীমিত রাখুন।

ঘর পরিষ্কার রাখুন এবং শিশুর আশপাশে ধূমপান, ধূপের ধোঁয়া ও অন্যান্য ক্ষতিকর ধোঁয়া এড়িয়ে চলুন।

সতর্কতা: নবজাতককে চুমু দেওয়ার সময় বিশেষ সতর্কতা অবলম্বন করুন, বিশেষ করে মুখ ও হাতে। শিশুকে ভিড়পূর্ণ স্থানে নিয়ে যাওয়ার আগে তার বয়স ও স্বাস্থ্য পরিস্থিতি বিবেচনা করুন।

১০. যেসব লক্ষণ দেখলে দ্রুত হাসপাতালে যাবেন

নবজাতকের কিছু লক্ষণ গুরুতর অসুস্থতার ইঙ্গিত হতে পারে। নিচের যেকোনো একটি লক্ষণ দেখা দিলে দেরি না করে চিকিৎসা নিন:

জ্বর (তাপমাত্রা ৩৮° সেলসিয়াস বা তার বেশি) অথবা শরীর অস্বাভাবিক ঠান্ডা হয়ে যাওয়া।

বুকের দুধ খেতে না পারা বা বারবার খাওয়া বন্ধ করে দেওয়া।

শ্বাস নিতে কষ্ট হওয়া, খুব দ্রুত শ্বাস নেওয়া বা শ্বাস বন্ধ হয়ে আসা।

খিঁচুনি, অস্বাভাবিক নিস্তেজতা বা জাগাতে অসুবিধা।

ত্বক বা চোখ দ্রুত হলুদ হয়ে যাওয়া।

বারবার বমি, সবুজ রঙের বমি বা পেট অস্বাভাবিক ফুলে যাওয়া।

নাভির চারপাশে লালচে ভাব, পুঁজ বা দুর্গন্ধ।

প্রস্রাব উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যাওয়া বা পানিশূন্যতার লক্ষণ।

নবজাতকের অবস্থা দ্রুত খারাপ হতে পারে। তাই এসব লক্ষণ দেখা দিলে ঘরোয়া চিকিৎসা করে অপেক্ষা করবেন না।

নতুন বাবা-মায়ের জন্য কিছু গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ

শিশুকে নিয়মিত বুকের দুধ খাওয়ান এবং দুধ খাওয়ার সঠিক পদ্ধতি শিখুন।

শিশুর কান্না, ঘুম ও খাওয়ার ধরন পর্যবেক্ষণ করুন।

শিশুর যত্ন নেওয়ার সময় পরিবারের সদস্যদের সহযোগিতা নিন।

চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া কোনো ওষুধ, হারবাল উপাদান বা ঘরোয়া চিকিৎসা ব্যবহার করবেন না।

শিশুর স্বাস্থ্য নিয়ে সন্দেহ হলে দ্রুত প্রশিক্ষিত স্বাস্থ্যকর্মী বা শিশু বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিন।

উপসংহার

নবজাতকের জীবনের প্রথম ২৮ দিন শিশুর সুস্থ বিকাশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সঠিকভাবে বুকের দুধ খাওয়ানো, শিশুকে উষ্ণ রাখা, পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা, নিরাপদ ঘুম নিশ্চিত করা এবং বিপৎসংকেত সম্পর্কে সচেতন থাকার মাধ্যমে অনেক স্বাস্থ্যঝুঁকি কমানো সম্ভব। পরিবারের সবার সচেতনতা ও সময়মতো চিকিৎসা নবজাতকের সুস্থ ভবিষ্যৎ গড়তে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

সেইফ হাসপাতাল — মা ও নবজাতকের সুস্থতায়, নিরাপদ মাতৃত্বের বিশ্বস্ত নাম।

বিশেষ দ্রষ্টব্য: এই ব্লগটি সাধারণ স্বাস্থ্যসচেতনতামূলক তথ্যের জন্য। এটি চিকিৎসকের সরাসরি পরামর্শের বিকল্প নয়। নবজাতকের কোনো বিপৎসংকেত দেখা দিলে দ্রুত হাসপাতালে যোগাযোগ করুন।