শহর পুলিশ ফাঁড়ির দক্ষিণ পাশে, স্টেডিয়াম রোড, লক্ষ্মীপুর, বাংলাদেশ
রিপোর্ট ডাউনলোড English Bangla
blog Photo
  • প্রকাশিত: Oct 15, 2026

পায়ুপথ ও মলদ্বারের সমস্যা: কখন সার্জন দেখাবেন?

পায়ুপথ ও মলদ্বারের বিভিন্ন সমস্যা অনেকের কাছেই অস্বস্তিকর বা লজ্জার বিষয়। ফলে অনেকেই চিকিৎসকের কাছে যেতে দেরি করেন। কিন্তু মলদ্বারে ব্যথা, রক্তপাত, চুলকানি, ফোলা বা পুঁজ বের হওয়ার মতো লক্ষণ অবহেলা করা উচিত নয়। এসব উপসর্গ পাইলস, অ্যানাল ফিশার, ফিস্টুলা, ফোঁড়া কিংবা অন্যান্য রোগের কারণে হতে পারে।

সময়মতো সঠিক রোগ নির্ণয় ও চিকিৎসা গ্রহণ করলে অনেক ক্ষেত্রেই জটিলতা কমানো সম্ভব। তাই পায়ুপথের সমস্যায় কখন সার্জনের পরামর্শ নেওয়া উচিত, কী কী লক্ষণ দেখা দিতে পারে এবং কীভাবে প্রাথমিকভাবে যত্ন নেবেন, তা জানা জরুরি।

পায়ুপথ ও মলদ্বারের সাধারণ সমস্যাগুলো কী কী?

১. পাইলস বা অর্শরোগ

পাইলস হলো মলদ্বার ও পায়ুপথের আশপাশের রক্তনালিসমৃদ্ধ টিস্যু ফুলে যাওয়া। এর ফলে পায়খানার সময় উজ্জ্বল লাল রক্ত দেখা, মলদ্বারে চুলকানি, অস্বস্তি বা বাইরে মাংসপিণ্ডের মতো কিছু বেরিয়ে আসার লক্ষণ দেখা দিতে পারে।

কখন সার্জন দেখাবেন?

বারবার পায়খানার সঙ্গে রক্ত গেলে।

মলদ্বারে ব্যথা বা ফোলা দেখা দিলে।

মাংসপিণ্ড বাইরে বেরিয়ে এলে বা ভেতরে না ঢুকলে।

খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তন ও সাধারণ চিকিৎসায় সমস্যা না কমলে।

মনে রাখবেন, মলদ্বার দিয়ে রক্তপাত হলেই সেটি পাইলস নয়। অন্য রোগের সম্ভাবনাও যাচাই করা প্রয়োজন।

২. অ্যানাল ফিশার বা মলদ্বারে ফাটল

শক্ত মল বের হওয়ার সময় পায়ুপথের ত্বকে ছোট ফাটল তৈরি হলে তাকে অ্যানাল ফিশার বলা হয়। এতে পায়খানার সময় তীব্র ব্যথা হতে পারে এবং পায়খানার পরও কিছুক্ষণ জ্বালাপোড়া থাকতে পারে। কখনো অল্প উজ্জ্বল লাল রক্তও দেখা যায়।

কখন সার্জন দেখাবেন?

পায়খানার সময় তীব্র ব্যথা হলে।

বারবার রক্তপাত হলে।

কয়েক সপ্তাহেও সমস্যা না কমলে।

মলত্যাগের ভয়ে পায়খানা আটকে রাখার অভ্যাস তৈরি হলে।

প্রাথমিক পর্যায়ে মল নরম রাখা, পর্যাপ্ত পানি পান এবং আঁশযুক্ত খাবার গ্রহণ উপকারী হতে পারে। তবে দীর্ঘস্থায়ী ফিশারের ক্ষেত্রে চিকিৎসকের পরামর্শে ওষুধ বা অন্য চিকিৎসার প্রয়োজন হতে পারে।

৩. অ্যানাল ফিস্টুলা বা মলদ্বারের অস্বাভাবিক নালি

ফিস্টুলা হলো মলদ্বারের ভেতর থেকে আশপাশের ত্বক পর্যন্ত তৈরি হওয়া অস্বাভাবিক একটি নালি। এটি অনেক সময় মলদ্বারের সংক্রমণ বা ফোঁড়ার পর দেখা দেয়। এর ফলে মলদ্বারের পাশে ছোট ছিদ্র, বারবার পুঁজ বা তরল বের হওয়া এবং ব্যথা হতে পারে।

কখন সার্জন দেখাবেন?

মলদ্বারের পাশে বারবার পুঁজ বের হলে।

একই স্থানে বারবার ফোঁড়া হলে।

দীর্ঘদিন ধরে ক্ষত শুকিয়ে আবার খুলে গেলে।

মলদ্বারের পাশে অস্বাভাবিক ছিদ্র দেখা দিলে।

ফিস্টুলা সাধারণত নিজে থেকে পুরোপুরি সেরে যায় না। এর ধরন ও অবস্থান নির্ণয় করে সার্জন উপযুক্ত চিকিৎসা নির্ধারণ করেন।

৪. পেরিয়ানাল অ্যাবসেস বা মলদ্বারের পাশে ফোঁড়া

মলদ্বারের আশপাশে সংক্রমণের কারণে পুঁজ জমে ফোঁড়া তৈরি হতে পারে। এতে তীব্র ব্যথা, ফোলা, লালচে ভাব, জ্বর বা বসতে অসুবিধা দেখা দিতে পারে।

কখন চিকিৎসা নেবেন?

মলদ্বারের পাশে ব্যথাযুক্ত ফোলা বা পুঁজ জমার সন্দেহ হলে দ্রুত চিকিৎসকের কাছে যান। জ্বর, কাঁপুনি বা ব্যথা দ্রুত বাড়লে জরুরি চিকিৎসা প্রয়োজন। এ ধরনের ফোঁড়ায় অনেক সময় সার্জনের মাধ্যমে পুঁজ বের করে দেওয়ার প্রয়োজন হয়।

নিজে থেকে ফোঁড়া ফাটানোর চেষ্টা করবেন না।

৫. মলদ্বারে চুলকানি ও জ্বালাপোড়া

মলদ্বারে চুলকানি বা জ্বালাপোড়া বিভিন্ন কারণে হতে পারে। যেমন—ত্বকের অ্যালার্জি, অতিরিক্ত ঘষাঘষি, আর্দ্রতা, সংক্রমণ, পাইলস বা অন্যান্য চর্মরোগ।

কখন সার্জন বা চিকিৎসক দেখাবেন?

চুলকানি দীর্ঘদিন স্থায়ী হলে।

ত্বকে ক্ষত, ফোলা বা রক্তপাত হলে।

পুঁজ বা অস্বাভাবিক স্রাব দেখা দিলে।

সাধারণ পরিচর্যায় সমস্যা না কমলে।

এ ধরনের সমস্যায় সব সময় সার্জারি প্রয়োজন হয় না। উপসর্গ অনুযায়ী চিকিৎসক বা উপযুক্ত বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া উচিত।

কোন লক্ষণগুলো অবহেলা করবেন না?

পায়ুপথ ও মলদ্বারের নিচের লক্ষণগুলো দেখা দিলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি:

পায়খানার সঙ্গে বারবার রক্ত যাওয়া।

মলদ্বারে তীব্র বা দীর্ঘস্থায়ী ব্যথা।

মলদ্বারের পাশে ফোলা, পুঁজ বা ক্ষত।

পায়খানার অভ্যাসে দীর্ঘস্থায়ী পরিবর্তন।

মলের সঙ্গে রক্ত বা কালো, আলকাতরার মতো মল।

অকারণে ওজন কমে যাওয়া বা দীর্ঘস্থায়ী দুর্বলতা।

মলত্যাগে দীর্ঘদিন সমস্যা হওয়া।

জরুরি সতর্কতা: প্রচুর রক্তপাত, মাথা ঘোরা বা অজ্ঞান হওয়ার অনুভূতি, কালো আলকাতরার মতো মল, কিংবা জ্বরের সঙ্গে তীব্র মলদ্বার ব্যথা হলে দ্রুত জরুরি বিভাগে যান।

পায়ুপথের সমস্যা হলে কখন সার্জনের কাছে যাবেন?

নিচের পরিস্থিতিতে একজন জেনারেল বা কোলোরেক্টাল সার্জনের পরামর্শ নেওয়া উপকারী:

১. পাইলস বা ফিশারের লক্ষণ বারবার দেখা দিলে।

২. মলদ্বারে ফোঁড়া বা ফিস্টুলার সন্দেহ হলে।

৩. মলদ্বারের কোনো সমস্যা ওষুধ বা সাধারণ পরিচর্যায় না কমলে।

৪. রক্তপাতের কারণ নির্ণয় করা প্রয়োজন হলে।

৫. চিকিৎসক পরীক্ষা করে অস্ত্রোপচার বা অন্য কোনো প্রক্রিয়ার প্রয়োজন মনে করলে।

সব রোগীর অস্ত্রোপচার প্রয়োজন হয় না। রোগের ধরন, তীব্রতা, রোগীর বয়স ও অন্যান্য শারীরিক অবস্থা বিবেচনা করে চিকিৎসা নির্ধারণ করা হয়।

পায়ুপথ ও মলদ্বার সুস্থ রাখতে করণীয়

প্রতিদিন পর্যাপ্ত আঁশযুক্ত খাবার খান; শাকসবজি, ফল ও পূর্ণশস্য খাদ্যতালিকায় রাখুন।

পর্যাপ্ত পানি পান করুন, যদি চিকিৎসক পানি সীমিত করার নির্দেশ না দিয়ে থাকেন।

পায়খানার বেগ হলে আটকে রাখবেন না।

অতিরিক্ত চাপ দিয়ে মলত্যাগ করবেন না এবং দীর্ঘক্ষণ কমোডে বসে থাকবেন না।

নিয়মিত শারীরিক পরিশ্রম করুন।

মলদ্বার পরিষ্কার রাখুন এবং অতিরিক্ত ঘষাঘষি এড়িয়ে চলুন।

চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া দীর্ঘদিন পাইলসের ক্রিম, স্টেরয়েডযুক্ত মলম বা অন্য ওষুধ ব্যবহার করবেন না।

পাইলস হলেই কি অপারেশন করতে হয়?

না। পাইলসের সব ক্ষেত্রে অস্ত্রোপচারের প্রয়োজন হয় না। প্রাথমিক পর্যায়ে খাদ্যাভ্যাসের পরিবর্তন, মল নরম রাখার ব্যবস্থা এবং চিকিৎসকের পরামর্শে ওষুধের মাধ্যমে উপসর্গ নিয়ন্ত্রণ করা যেতে পারে। কিছু ক্ষেত্রে বিশেষ পদ্ধতি বা অস্ত্রোপচার প্রয়োজন হয়।

একইভাবে, ফিশার, ফিস্টুলা ও অন্যান্য সমস্যার চিকিৎসাও রোগের ধরন অনুযায়ী আলাদা। তাই নিজে নিজে রোগ নির্ণয় না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়াই সবচেয়ে নিরাপদ।

উপসংহার

পায়ুপথ ও মলদ্বারের সমস্যা লজ্জা বা সংকোচের কারণে অবহেলা করা উচিত নয়। সময়মতো চিকিৎসা নিলে রোগের কারণ নির্ণয়, উপযুক্ত চিকিৎসা গ্রহণ এবং সম্ভাব্য জটিলতা কমানো সহজ হয়। মলদ্বারে ব্যথা, রক্তপাত, ফোলা বা পুঁজের মতো লক্ষণ দেখা দিলে দেরি না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।

সেইফ হাসপাতাল — আপনার সুস্বাস্থ্য ও মানসম্মত চিকিৎসাসেবায় বিশ্বস্ত সহযোগী।

বিশেষ দ্রষ্টব্য: এই ব্লগটি সাধারণ স্বাস্থ্যসচেতনতামূলক তথ্যের জন্য। এটি চিকিৎসকের সরাসরি পরামর্শের বিকল্প নয়। উপসর্গ দেখা দিলে চিকিৎসকের মাধ্যমে সঠিক রোগ নির্ণয় ও চিকিৎসা গ্রহণ করুন।